বঙ্গসমাজে ‘আপনার উদ্দেশ্যে রাখা আফিম অনুগ্রহ করে গ্রহণ করুন’ ধরনের অনুরোধ প্রমিতমানের সম্ভাষণ হিসেবে আদৃত হতো। এমনকি উৎপাতকারী শিশুকেও আফিম খাইয়ে শান্ত করা হতো।

পর্তুগিজ পর্যটক পাইরেসের (Pyres, ১৫১৬) লেখায় সর্বপ্রথম আফিমের উল্লেখ দেখা যায়। আরবীয় ও পারসিকদের আগমনের সঙ্গে বঙ্গদেশে আফিম প্রবর্তনের যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে করা হয়। আবগারির মাধ্যমে মুগল শাসকেরা আফিমকে তাদের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে ব্যবহার করতেন। সমুদ্রপথে যাতায়াতকারী ইংরেজ, পর্তুগিজ, ফরাসি ও অন্যান্য কোম্পানি বঙ্গদেশ থেকে আফিম রপ্তানি শুরু করলে এখানে ব্যাপকভাবে পপি চাষের বিস্তার ঘটে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৭৩ সালে এ ব্যবসায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে। এ ব্যবসায়ে রাষ্ট্রীয় একচ্ছত্র আধিপত্য ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত বজায় ছিল যতদিন না আফিম উৎপাদন দাপ্তরিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছিল।

এক সময় পৃথিবীব্যাপী আফিম সেবন প্রায় সার্বজনীনতা লাভ করে এবং আঠারো শতকের শেষে এটির সেবন একটি ফ্যাশনে পরিণত হয়। বঙ্গসমাজে ‘আপনার উদ্দেশ্যে রাখা আফিম অনুগ্রহ করে গ্রহণ করুন’ ধরনের অনুরোধ প্রমিতমানের সম্ভাষণ হিসেবে আদৃত হতো। এমনকি উৎপাতকারী শিশুকেও আফিম খাইয়ে শান্ত করা হতো। সেনাবাহিনী ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আফিম ব্যবহার ছিল অতি সাধারণ ব্যাপার। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আফিম উৎপাদনে বঙ্গদেশের নির্দিষ্ট জেলাগুলিতে বিশেষ করে যশোর, নদীয়া (বাংলাদেশ অংশে বর্তমান কুষ্টিয়া জেলা) ও রাজশাহী অঞ্চলসমূহে পর্যাপ্ত পরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগ করে।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি উনিশ শতকের গোড়া থেকে চীনের সঙ্গে ব্যবসায়ে ঘাটতি মেটাতে বঙ্গদেশ থেকে চীনে আফিম রপ্তানি শুরু করে। চীনা শাসকরা ১৮৩৯ সালে আফিম আমদানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অবৈধ উপায়ে এ ব্যবসা অব্যাহত রাখে। কোম্পানির অবৈধ আফিম ব্যবসার কারণে চীন ও ব্রিটেনের মধ্যে যুদ্ধ বাধে। চীনারা পরাজিত হয় এবং চীন ১৮৪২ সালে নানজিং চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। ব্রিটেনের প্রয়োজন ছিল আফিম ব্যবসা অব্যাহত রাখার অনুমতি লাভ করা। আফিমের বাজার সম্প্রসারণের দাবির প্রশ্নে ব্রিটিশের সঙ্গে চীনাদের দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধ (১৮৫৮) শুরু হয়। চীন আবারও পরাজিত হয়। ১৮৫৮ সালে সম্পাদিত তিয়েনসিন চুক্তি অনুসারে আনুষ্ঠানিকভাবে চীনে আফিম রপ্তানি বৈধতা লাভ করে। শীঘ্রই আফিমে চীন সয়লাব হয়ে যায়। এ চুক্তির ফলে বঙ্গদেশে লক্ষণীয়ভাবে আফিম উৎপাদন বেড়ে যায়।

ঔপনিবেশিক সরকারের নিকট আফিম আয়ের এমনই গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হয় যে, রয়াল কমিশন অব ওপিয়াম অব ১৮৯৫ মানুষের নৈতিক ও শারীরিক বিপর্যয়কে অগ্রাহ্য করে ব্রিটিশের আফিম ব্যবসাকে সমর্থন দান করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে আফিমের আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ সূচিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রভাব সৃষ্টির প্রয়াস অব্যাহত থাকার ফলে ১৯০৯, ১৯১২-১৪ ও ১৯২৪-২৫ সালে আফিমের ওপর বিশ্ব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চাপের অধীনে ঔপনিবেশিক ভারত শেষ পর্যন্ত আফিম ব্যবসা সীমিত ও নিয়ন্ত্রণ করায় সম্মত হয়। ১৯৩৫ সালের সংবিধানের অধীনে প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে ১৯৩৭ সালে আফিমের উৎপাদন ও ব্যবসা পুরোপুরি নিষিদ্ধ হয়।

সূত্র: বাংলাপিডিয়া

Advertisements